জয় কিষাণ: ১৯ নভেম্বর ২০২২

জয় কিষাণ ডেস্ক
লিখেছেন জয় কিষাণ ডেস্ক পড়ার সময় 7

আজ ‘ফতেহ দিবস’

সারা দেশের কৃষকেরা তিনটি কালা কৃষি আইন বাতিলের বর্ষপূর্তিতে শনিবার ১৯ নভেম্বর ‘ফতেহ দিবস’ পালন করছেন। ১৯ নভেম্বর ২০২১ অর্থাৎ গত বছর – সংযুক্ত কিষাণ মোর্চার ৩৮৩ দিন আন্দোলনের জেরে মোদি সরকারকে নতি স্বীকার করে ৩টি কালো কৃষি আইন বাতিল করতে হয়। অব্যাহত বিক্ষোভের মুখে ৯ ডিসেম্বর ২০২১ মোদি সরকার লিখিত আশ্বাস দেয় সংযুক্ত কিষাণ মোর্চার প্রতিনিধিদের নিয়ে এমএসপি আইন সৃষ্টির কমিটি গঠন করা হবে। অন্যান্য দাবিগুলিও পূরণ করা হবে। এই আশ্বাসের ভিত্তিতেই কৃষকরা দিল্লি সীমান্তে তাঁদের ঐতিহাসিক সংগ্রাম স্থগিত রেখে ১১ ডিসেম্বর ২০২১-এ বাড়ি ফিরেছিলেন, যাতে ৭৩৪ জন কৃষক শহিদ হন। কৃষকদের এই সংগ্রাম স্বাধীন ভারতের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় এবং দীর্ঘতম গণ-বিক্ষোভ। যদিও সরকার তার প্রতিশ্রুতি পূরণ করেনি।

কৃষকদের ওপর শাসক ও কর্পোরেটদের দমন-পীড়ন এখনও বন্ধ হয়নি। কেন্দ্রীয় সরকারের কৃষক বিরোধী নীতির প্রতিবাদে লড়াই চালিয়ে দাবি আদায়ের ডাক দিয়েছে সংযুক্ত কিষাণ মোর্চা। সারা দেশে কৃষকরা আবার আন্দোলনের জন্য জোট বাঁধছেন।

উল্লেখ্য, বৃহস্পতিবার নয়া দিল্লিতে এক সাংবাদিক সম্মেলনে সংযুক্ত কিষাণ মোর্চার নেতা দর্শন পাল এও জানান, সারা দেশে ২৬ নভেম্বর ‘রাজভবন চলো’ অভিযান-এর ডাক দেওয়া হয়েছে। দর্শন পাল ছাড়াও এই সাংবাদিক সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন  হান্নান মোল্লা, যুধবীর সিং, অভীক সাহা এবং অশোক ধাওয়ালে।

সারের এমআরপি নির্দিষ্ট করা ও ট্যাগিং বন্ধ করার ক্ষেত্রে জয় কিষাণ আন্দোলনের ফের সাফল্য

আবারও দাবি আদায়ে সাফল্য জয় কিষাণ আন্দোলনের হুগলি জেলা কমিটির। সার ও বীজের দাম নির্দিষ্টকরণ, সারের ক্ষেত্রে ট্যাগিং বন্ধ করা-সহ একগুচ্ছ দাবিতে সাম্প্রতিককালে হুগলি জেলায় ব্যাপক কৃষক আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে কৃষক আন্দোলন। এর মধ্যে কয়েকটি দাবির ক্ষেত্রে সাফল্যও মিলেছে। শুক্রবার দাবি আদায়ের ক্ষেত্রে ‘জয় কিষাণ আন্দোলন’-এর বিক্ষোভের ফলে আরও একধাপ সাফল্য পেলেন হুগলি জেলার পোলবা দাদপুর ব্লকের কৃষকেরা।

সংগঠনের হুগলি জেলা সভাপতি সুশান্ত কাঁড়ি জানিয়েছেন, পোলবা দাদপুর ব্লকের পাটনা সমবায় সমবায় সমিতি সারের ক্ষেত্রে এমআরপি চালু করা ও ট্যাগিং বন্ধ করার দাবি মেনে নিয়েছে। সুশান্ত কাঁড়ি আরো জানিয়েছেন, বৃহস্পতিবার থেকে এই সমবায় সমিতির সামনে জয় কিষাণ আন্দোলনের ব্লক সভাপতির নেতৃত্বে অবস্থান বিক্ষোভ চালাচ্ছিলেন কৃষকরা। সেই আন্দোলনের জেরেই সারের এমআরপি চালু করা ও ট্যাগিং বন্ধ করার দাবি মেনে নিয়েছেন পাটনা সমবায় সমিতি কর্তৃপক্ষ।

ধর্না, রাস্তা অবরোধের জন্য কৃষক সংগঠনগুলির ওপর পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রীর তীব্র আক্রমণ

কৃষকদের ন্যায্য আন্দোলনকে কালিমালিপ্ত করার চেষ্টা করলেন পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী ভাগবন্ত সিং মান।  পাঞ্জাবের কৃষকদের আন্দোলনে নাজেহাল অবস্থা রাজ্য সরকারের। সেদিক থেকে দৃষ্টি ঘোরাতেই পাঞ্জাব সরকার এই পথ অবলম্বন করল বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল।  

ভারতীয় কিষাণ ইউনিয়ন বা বিকেইউ (একতা উগ্রাহন)-এর সাধারণ সম্পাদক সুখদেব সিং কোকরিকালান, মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যের জন্য তীব্র সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেন, “রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী নিজেই একজন কৃষক পরিবারের সন্তান। তিনি কীভাবে এতটা অসংবেদনশীল হতে পারেন? চলতি বছরে রাজ্য সরকার মুগ কিনেছে মোট উৎপাদনের মাত্র দশ শতাংশ। শস্য সংগ্রহ না করা, জমি অধিগ্রহণ করে কৃষকদের সঠিক ক্ষতিপূরণ না দেওয়া, খড়ের ব্যাপারে উপযুক্ত ব্যবস্থা না করা ইত্যাদি একাধিক ইস্যুতে রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে কিষাণদের ক্ষোভ এখন তুঙ্গে। আমাদের দাবি পূরণ না হলে আমরা ধর্না চালিয়ে যাবো। এটিই আমাদের গণতান্ত্রিক প্রতিবাদের হাতিয়ার।  আমি হতবাক যে আমাদের ত্যাগ ও সংগ্রামকে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী উপেক্ষা করেছেন এবং উলটে তিনি কুৎসা রটাচ্ছেন”।

প্রসঙ্গত, পাঞ্জাব জুড়ে বিভিন্ন সংগঠনের ডাকে পাঁচটি অবস্থান বিক্ষোভে পাঞ্জাব সরকারের নাজেহাল অবস্থা।  অমৃতসর (কাথুনাঙ্গল), ফরিদকোট তেহনা টি পয়েন্টে, মুকেরিয়ান সুগার মিল সংলগ্ন এলাকা, পাতিয়ালার ধারেরি টোল প্লাজা এবং তালওয়ান্ডি সাবোতে এই ধর্নাগুলি গত কয়েকদিন ধরেই রাজ্যের মাথা ব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কৃষকদের সঙ্গে পাঞ্জাব সরকার ও কেন্দ্রীয় সরকার ক্রমাগত বিশ্বাসঘাতকতা করে যাচ্ছে বলে অভিযোগ করে এই বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

সূত্র- দ্য ট্রিবিউন

বিশদে পড়তে এখানে ক্লিক করুন

আজ বিজয় দিবস, এখনও বহু দাবি কার্যকর হয়নি, সংগ্রাম জারি থাকবে, সংযুক্ত কিষাণ মোর্চার দাবি

১। সমস্ত ফসলের জন্য সব কৃষককে সি-২ প্লাস ৫০ শতাংশ হারে ন্যূন্যতম সহায়ক মূল্য প্রদানের বিষয়টি আইনিভাবে নিশ্চিত করতে হবে, ২। ঋণগ্রস্ত কৃষককে দেনার বোঝা থেকে মুক্তি দিতে ঋণ মকুব প্রকল্প চালু করা, ৩। বিদ্যুৎ সংশোধনী বিল ২০২০ প্রত্যাহার, ৪। লখিমপুর খেরিতে কৃষক ও সাংবাদিক হত্যায় অভিযুক্ত দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের রাষ্ট্রীয় প্রতিমন্ত্রী অজয় মিশ্রকে মন্ত্রীত্ব থেকে বহিষ্কার করার পাশাপাশি তার বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ করা, ৫। প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ফসলের ক্ষতির জন্য কৃষকদের দ্রুত ক্ষতিপূরণ দিতে ব্যাপক ফসল বিমা প্রকল্প কার্যকর করা, ৬। প্রান্তিক, ক্ষুদ্র ও মাঝারি স্তরের কৃষক এবং কৃষিমজুরদের জন্য মাসিক ৫ হাজার টাকার পেনশন চালু করা, ৭। কৃষক আন্দোলনের সময় চাষিদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার, ৮। কৃষক আন্দোলনে শহিদ কৃষকদের পরিবার পিছু ক্ষতিপূরণ।

৭৩৪ জন শহীদের রক্ত হবে নাকো ব্যর্থ

ইউনিয়ন সরকারের কালা কৃষি আইন বাতিল করার দাবিতে ২০২০ সালের ২৫ নভেম্বর মূলত পাঞ্জাব ও হরিয়ানার কৃষকরা ‘দিল্লি চলো’র ডাক দেন। তার আগে স্থানীয় ভাবে প্রতিবাদ হলেও কৃষক আন্দোলন তাতে গতি পায় নি। যদিও তার আগে কেন্দ্র সরকার কৃষকদের সঙ্গে আলাপ আলোচনা চালালেও তা ফলপ্রসূ হয় নি। স্বাভাবিকভাবেই কৃষকরা সন্তুষ্ট ছিলেন না। কারণ এই আইন লাগু হলে কৃষকদের কর্পোরেট সংস্থাগুলির দয়ায় বাঁচতে হত।

ভারতবর্ষের ইতিহাস কৃষক আন্দোলন অতীতে অনেকবার প্রত্যক্ষ করেছে।কৃষকদের রক্তে ভারতবর্ষের রাজপথ বহুবার সিক্ত হয়েছে। সামন্তপ্রভুদের বিরুদ্ধে কৃষকদের লড়াই যার ফলস্রুতিতে ভূমি সংস্কার আইন প্রণয়নের সাক্ষী থেকেছে এই দেশ।  বর্তমান সময়ে আদানি, আম্বানি সহ অন্যান্য কর্পোরেট পুঁজির দাসত্ব করা বিজেপি সরকার কৃষকদের কর্পোরেট পুঁজির কাছে নতিস্বীকার করাতে বাধ্য করার চেষ্টা করলেও, কৃষক আন্দোলনের চাপে তারা পিছু হঠতে বাধ্য হয়।

আমাদের দেশবাসীর জন্য অন্ন ফলানো কৃষকরা যদি বিপদে পড়েন, মৃত্যু বরন করেন, তবে তা দেশবাসীর জন্য সুখকর নয়। এই সত্য যত দ্রুত আমরা বুঝব তত আমাদের পক্ষে তা হিতকারী হবে। তাই শুধু দেশ নয় বিশ্বের বেশিরভাগ দেশের রাষ্ট্রনেতারা ও কৃষকরা ভারতীয় কৃষকদের পক্ষে অবস্থান নেন। অস্ট্রেলিয়া সহ কানাডা, ইতালি, নিউজিল্যান্ড, পাকিস্তান, ইউনাইটেড কিংডম, ইউনাইটেড স্টেটস   এই কৃষি আইনের সমালোচনা করেন। সারা বিশ্বব্যাপী কৃষক আন্দোলনের চাপে পড়ে কেন্দ্র এই কৃষি আইন বাতিল করতে উদ্যোগী হয়।

মোদি সরকারের লিখিত প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতে দিল্লির কৃষক আন্দোলন স্থগিত রাখা হয়েছিল। এক বছর পেরিয়ে গেছে কিন্তু কোন প্রতিশ্রুতি পালন হয়নি। যদিও সংযুক্ত কৃষক মোর্চার তিনটি কৃষি আইন বাতিলের দাবি মেনে নিতে বাধ্য হলেও মোদি সরকারের কৃষকদের ওপর দমন-পীড়ন বন্ধ হয়নি।

লড়াই এখনও শেষ হয়নি। দেশের নানা প্রান্তের চাষিরা আবার কেন্দ্রীয় সরকারের কৃষক বিরোধী নীতির বিরুদ্ধে জোট বাঁধছেন। সংযুক্ত কিষাণ মোর্চার তথ্যমতে এখনও পর্যন্ত এই আন্দোলনে ৭৩৪ জন আন্দোলনকারী শহিদ হয়েছিলেন। তাঁদের বলিদান ব্যর্থ হবে না।

কৃষকের থেকে লুট: ১৭ নভেম্বর ২০২২

ট্যাগ করা হয়েছে:
এই নিবন্ধটি শেয়ার করুন
মতামত দিন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *