পদযাত্রার সূচনা খুব সুন্দর, যদিও গন্তব্যে পৌঁছতে লম্বা পথ বাকি

যোগেন্দ্র যাদব
লিখেছেন যোগেন্দ্র যাদব পড়ার সময় 6

যোগেন্দ্র যাদব

‘ ভারত জোড়ো যাত্রা’য় শামিল মানুষেরা রাস্তাকেই একমাত্র রাস্তা হিসেবে বেছে নিয়েছেন। আর যোগেন্দ্র যাদব ভারতের দক্ষিণ থেকে উত্তরে বিস্তৃত সেই রাস্তা থেকেই লিখছেন এই ঐতিহাসিক এই পদযাত্রা বিষয়ে। লেখাটি বাংলায় অনুবাদ করেছেন অতনু সিংহ

প্রথম ৫ দিনের ভিত্তিতে দীর্ঘ ৫ মাসব্যাপী পদযাত্রা সম্পর্কে আগাম উপসংহার রচনা হাস্যকর হবে। তবে সূচনার কয়েকদিন অতিক্রান্ত হওয়ার ফলে গোটা যাত্রা সম্পর্কে যে আভাস পাওয়া যাচ্ছে তা থেকে অনেক কিছুই প্রত্যাশা করা যায়।”

পদযাত্রা কেমন চলছে? আপনি কোনো প্রভাব দেখেছেন? নির্বাচনে কোনো সুবিধা হবে কি? এই যাত্রা থেকে আদৌ কিছু অর্জন করা যাবে? যখন কন্যাকুমারী থেকে ‘ভারত জোড়ো যাত্রা’ বেরিয়েছে, তারপর আমার ফোন বেজেই চলেছে। খুব চেনা প্রশ্নের ঝড় বয়ে যাচ্ছে চলভাষের ভিতর। টিভিতেও “তু-তু, ম্যায়-ম্যায়” শুনছি যেন। যাত্রা থেকে কী অর্জন করা যাবে তা নির্ভর করছে এর উদ্দেশ্যের ওপর। পদযাত্রা অনেক ধরনের হতে পারে। কারও জন্য এটা নিছক হাঁটা এবং কারও জন্য ব্যায়াম। আবার যাযাবর সমাজের জীবনযাত্রার অঙ্গই এই হেঁটে চলা, পথব্যবসায়ীদের কাছে আবার হাঁটাই হল বাণিজ্য। কেউ কেউ ব্রতপালনের মতো করে পথ চলে আবার কেউ বা আকাঙ্ক্ষা নিয়ে – কারও কারও পথচলার মধ্যে থাকে দেখার আকাঙ্ক্ষা। কিন্তু ঈশ্বরকে খুঁজে পাওয়ার লক্ষ্যে হেঁটে যাওয়া মানুষের সংখ্যা খুব কমই রয়েছে।

রাজনৈতিক মিছিলের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। এতেও কিছু মানুষ পর্যটকের মতো শামিল হন, কেউ বা দর্শনার্থীর মতো, আবার কারও কারো অংশগ্রহণ নেহাতই টিকিটের জন্য। নির্বাচনী প্রচারেরও দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে আমাদের দেশে। আবার ইতিহাসে এমন কিছু পদযাত্রার নজির রয়েছে, যার মাধ্যমে দেশ নিজেকে চিনতে পেরেছে, ফিরে পেয়েছে হারানো আত্মবিশ্বাস ।

উল্লেখিত সমস্ত কিছুরই নমুনা রয়েছে ‘ভারত জোড়ো যাত্রা’-তে। দেশের একটি বড় দল আয়োজিত এই ধরনের লম্বা এক পদযাত্রায় যদি কিছু সংখ্যক পদযাত্রী থাকেন, তাহলে নিশ্চয়ই সেখানে পর্যটক, পালোয়ান, টিকিট প্রত্যাশী এবং দর্শকরাও থাকবেন। স্পষ্টতই এই যাত্রার সাফল্য-ব্যর্থতা এইসব ছোটখাটো আকাঙ্ক্ষার দাঁড়িপাল্লায় পরিমাপ করা যায় না। রাজনীতির পণ্ডিতরা এটিকে কংগ্রেস পার্টি বা রাহুল গান্ধির লাভ-ক্ষতির প্রেক্ষিতে বিচার করবেন। তবে কোনো একটি দল বা নেতার মুনাফা জাতীয় স্বার্থের মাপকাঠি হতে পারে না।

আজকের প্রেক্ষাপটে ‘ভারত জোড়ো যাত্রা’-র সাফল্যের একটাই মাপকাঠি হতে পারে। আমার মতো মানুষ কিছু প্রত্যাশা নিয়ে এই যাত্রায় যুক্ত হয়েছেন। যেমন, দেশের ভবিষ্যতের কালো মেঘ দূর করতে, আমাদের গণতন্ত্র, সংবিধান, স্বাধীনতা ও উত্তরপ্রজন্মকে বাঁচাতে, দেশকে যাঁরা ঐক্যবদ্ধ করেছেন তাঁদের পক্ষে রাজনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্য গড়ার লক্ষ্যে এই পদযাত্রা অবদান রাখতে পারে। দেশের সংকটময় সময়ে এই পদযাত্রাকে অন্য আর কোনোভাবে দেখতে চাইলে, সেটা উদাসীন হয়ে থাকা ছাড়া অন্য কিছু নয়।

প্রথম ৫ দিনের ভিত্তিতে দীর্ঘ ৫ মাসব্যাপী পদযাত্রা সম্পর্কে আগাম উপসংহার রচনা হাস্যকর হবে। তবে সূচনার কয়েকদিন অতিক্রান্ত হওয়ার ফলে গোটা যাত্রা সম্পর্কে যে আভাস পাওয়া যাচ্ছে তা থেকে অনেক কিছুই প্রত্যাশা করা যায়। প্রথম সপ্তাহে, এই যাত্রা তামিলনাড়ুর কন্যাকুমারী এবং কেরালার তিরুবনন্তপুরম জেলাগুলির মধ্যে দিয়ে গেছে। দুটিই কংগ্রেসের অপেক্ষাকৃত শক্তিশালী এলাকা। তাই এইসব এলাকায় এই পদযাত্রায় যে বিপুল জনসমর্থন মিলিছে, তা বিস্ময়কর নয়। তবে এটাও উল্লেখযোগ্য যে এই এলাকাগুলো দিয়ে পদযাত্রার গোটা সময় এই সফরকে স্বাগত জানাতে রাস্তার দু’পাশে মানুষ দাঁড়িয়েছিলেন, এমনকি ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে ভিড় জমিয়ে রেখেছিলেন জনতা। এটা হতেই পারে যে, জনতার সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ দলীয় কর্মীদের মাধ্যমেই সমবেত হয়েছিলেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও এটা একটা অর্জন।

পদযাত্রা শুরু হওয়ার পর থেকেই অনেক উৎসাহী দর্শকও আমাদের চোখে পড়ছে। এই গণমানুষের একটা অংশ সেরকম সাধারণ লোকেরা, যাঁরা কোনো দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত নন, সংঘবদ্ধ হননি, এই দীর্ঘতম মিছিলে নিজেরাই এসেছেন। এইসব জনতার চোখে সেই দীপ্তির দেখা মিলেছে, যা অনেক অন্ধকারের মাঝেও একটু আশার আলো জাগায়। এঁদেরকে কংগ্রেসের ভোটার বা সমর্থক মনে করা ঠিক নয়। হতে পারে এমন পদযাত্রায় প্রতি এটা তাঁদের সম্মান প্রদর্শন, যা আমাদের সংস্কৃতির অংশ। সেসব আগামী কয়েকদিনের মধ্যে বোঝা যাবে। তবে এই সফর যে ইতিবাচক অবস্থা ইতিমধ্যেই তৈরি করেছে, তা অস্বীকার করা যায় না। এর নির্বাচনী ফলাফল কী হবে, তা এখনই বলা যাচ্ছে না। গুজরাত ও হিমাচলের নির্বাচনে এর কোনো প্রভাব পড়বে বলেও মনে হয় না। কিন্তু যে ইতিবাচক আবহ তৈরি হচ্ছে, তার মধ্যে কোথাও রাজনৈতিক নিস্পৃহতার পরিবেশ ভাঙার সম্ভাবনাও রয়েছে।

“আজকের প্রেক্ষাপটে ‘ভারত জোড়ো যাত্রা’-র সাফল্যের একটাই মাপকাঠি হতে পারে। আমার মতো মানুষ কিছু প্রত্যাশা নিয়ে এই যাত্রায় যুক্ত হয়েছেন। যেমন, দেশের ভবিষ্যতের কালো মেঘ দূর করতে, আমাদের গণতন্ত্র, সংবিধান, স্বাধীনতা ও উত্তরপ্রজন্মকে বাঁচাতে, দেশকে যাঁরা ঐক্যবদ্ধ করেছেন তাঁদের পক্ষে রাজনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্য গড়ার লক্ষ্যে এই পদযাত্রা অবদান রাখতে পারে।”

দেশের জনতার মর্জির ওপর এই পদযাত্রা কতটা প্রভাব ফেলবে, সে সম্পর্কে আগাম মন্তব্য করা অপ্রয়োজনীয়। তবে একটা বিষয় নিশ্চিত। কংগ্রেসের মতো একটি বড় দলের নেওয়া এই উদ্যোগ দেশের নীরবতা এবং একাকীত্বের অনুভূতিকে ভেঙে দিয়েছে। বহু মানুষ যাঁরা কংগ্রেসকে সমর্থন করেন না, প্রকাশ্যে কংগ্রেসের বিরোধিতা করেছেন, তাঁরা এই যাত্রার সমর্থনে এগিয়ে এসেছেন, দেশের গণ-আন্দোলন সমূহের একটা বড়ো অংশ কন্যাকুমারী থেকেই এই পদযাত্রায় সামিল হয়েছে।

এই আন্তরিক ও অপ্রত্যাশিত সমর্থন খোদ কংগ্রেসের পদযাত্রীদের মনোবল বাড়িয়ে দিয়েছে। গত এক সপ্তাহ ধরে যাঁরা পদযাত্রায় যোগ দিতে ইচ্ছুক, তাঁদের কাছ থেকে বার্তা আসছে যে অন্তত একটি ছোট পরিসরে হলেও অনুভূতিটা এমন যে আমরা একা নই। দেশ বদলানোর ডাক এখন থেকে বড় বড় কথার মতো শোনাতে পারে। কিন্তু যাঁরা দেশকে ঐক্যবদ্ধ করতে চান, তাঁদের মধ্যে নিজেদের বদলানোর সূচনা ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে। এই সূচনাটা খুব সুন্দর। কিন্তু এখনও অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে।

যোগেন্দ্র যাদব

জন্ম ৫ সেপ্টেম্বর ১৯৬৩। একজন ভারতীয় আন্দোলনকর্মী এবং রাজনীতিবিদ। তার প্রধান আগ্রহ হলো রাষ্ট্রবিজ্ঞান এবং সামাজিক বিজ্ঞান। ২০০৪ সাল থেকে তিনি দিল্লির সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অফ ডেভলপিং সোসাইটিস (সিএসডিএস) এর একজন সিনিয়র ফেলো। স্বরাজ ইন্ডিয়ার প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি।

ট্যাগ করা হয়েছে:
এই নিবন্ধটি শেয়ার করুন
মতামত দিন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *