দেউচা পাচামি: কোন দিকে চলেছি আমরা?

জয় কিষাণ ডেস্ক
লিখেছেন জয় কিষাণ ডেস্ক পড়ার সময় 13

তারণ দেওল

প্রস্তাবিত দেউচা পাচামি কয়লা উত্তোলন কেন্দ্র বিষয়ে ডাউন টু আর্থ পত্রিকায় প্রকাশিত তারণ দেওলের নিবন্ধ অনুবাদ করেছেন তাপস কর

দেউচা পাচামি: কোন্‌ দিকে চলেছি আমরা?

আমরা এমন একটা সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি, যখন ভারত কয়লার ওপর নিজের নির্ভরতা ধাপে ধাপে কমানোর চেষ্টা করছে। এদিকে আমাদের রাজ্য পশ্চিমবঙ্গ বীরভূমের গভীর কয়লা-ব্লক থেকে আকরিক কয়লা উত্তোলনের এক উচ্চাকাঙ্ক্ষী প্রকল্পের মাধ্যমে নিজের অর্থনীতিকে পাল্টাবার আশা করছে! পশ্চিমবঙ্গের সরকারি ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী দেউচা-পাচামি-দেওয়ানগঞ্জ হরিণসিঙ্গা ব্লকে সঞ্চিত কয়লার পরিমাণ ১২০ কোটি টনের মতো এবং এটা ভারতের সবথেকে বড় কয়লা-ব্লক। কিন্তু আজ অবধি এত বড় আর গভীর ব্লক থেকে কয়লা তোলার অভিজ্ঞতা ভারতের নেই।

হয়তো এই কারণেই ভারতের সরকারি কয়লা তোলা ও পরিশোধনের সংস্থা, ‘দ্য কোল ইন্ডিয়া লিমিটেড’ (কোল ইন্ডিয়া ), যারা দেশের মোট কয়লা ৮০ শতাংশই উৎপাদন করে থাকে, তারা এই ব্লক থেকে কয়লা তোলার চেষ্টাই করেনি। ২০১৬ সালে যখন কেন্দ্র সরকার এই কয়লা-ব্লক বরাদ্দ করার জন্য আবেদনপত্র চায়, তখন ঠিক হয়েছিল যে ব্লকটি পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, কর্ণাটক, পাঞ্জাব, উত্তরপ্রদেশ, তামিলনাড়ু এই ছয় রাজ্য এবং একটি সরকারি শক্তি উৎপাদন কোম্পানি, সতলুজ জল বিদ্যুৎ নিগম, এগুলোর মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হবে। কিন্তু অন্যরা কেউ তাদের ব্লকের ক্ষেত্রে উৎসাহী না হওয়ায়, ২০১৯ সালে এই কয়লা উত্তোলনের বরাত পশ্চিমবঙ্গকে দেওয়া হয়।

পশ্চিমবঙ্গ সরকার এই কয়লাখনিকে একটা উন্নয়নমূলক প্রকল্প হিসাবে জনসমক্ষে প্রচার চালাচ্ছে। রাজ্য সরকারের দাবি কয়লা উত্তোলনের দরুণ নাকি লাখখানেকের বেশি মানুষের কর্মসংস্থান হবে। কিন্তু ইতিমধ্যেই এই কয়লাখনিকে ঘিরে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। নানাস্তর থেকে প্রতিবাদ সংগঠিত হচ্ছে, অনেকেই প্রকল্পের বিরোধিতা করছেন। বিরোধিতার কারণ, এই প্রকল্পের দরুণ পরিবেশ দূষণ ও ভিটেমাটি থেকে স্থানীয় মানুষের উচ্ছেদের সম্ভাবনা। আর ঠিক এই কারণেই ২০২১-এর নভেম্বরে প্রকল্পের প্রথম পর্বের ঘোষণার পরেও ইতিমধ্যেই রাজ্য সরকারকে দু’বার তার প্রস্তাবিত ক্ষতিপূরণের প্যাকেজ বদলাতে হয়েছে।

এই অঞ্চল জুড়ে রয়েছে প্রায় ৪২ হাজার ১৫০ লক্ষ টন ব্যাসল্ট, আর ব্যাসল্টের বোল্ডারের গড় দাম হল প্রতি টনে ২৩০ টাকা। যদি ঠিকভাবে বিষয়টা কাজে লাগানো যায়, তবে শুধু পাথর থেকেই রাজস্ব আসতে পারে ৯০০ কোটি টাকার বেশি। বর্তমানে ওই কয়লা ব্লকের ১৮টা গ্রামে এরকম অনেক ছোট ছোট পাথর খাদান আছে। তাদের মধ্যে কিছু কিছু আইনি হলেও বেশিরভাগই বেআইনি।

এত বিশাল কয়লা-ব্লক কে সামলানো কঠিন

২০১৬ সালের মে মাসে জিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া একটা রিপোর্ট প্রকাশ করে। তাতে বলা হয়, “এটি এমন একটি বিশেষ ধরনের গঠনযুক্ত কয়লা সঞ্চয় যা অদ্বিতীয়, যার সঙ্গে ভারতের আর কোনো কয়লাক্ষেত্রের কোনোরকম মিল নেই।” ওই একই রিপোর্টে বলা হয়, ১২০ কোটি টন কয়লাযুক্ত এই ব্লক থেকে কয়লা উত্তোলন ‘বেশ লোভনীয়’, কিন্তু বর্তমানে ‘মাটির তলা এবং খোলামুখ খনি’-র যে প্রযুক্তি আমাদের কাছে রয়েছে, তা দিয়ে এই কাজ করা সহজ নয়। ১৩৬০ হেক্টর এলাকা জুড়ে বিস্তৃত আর কয়লা তোলার পক্ষে উপযোগী পুরুত্ব থেকে অনেক বেশি পুরু সাতটা সিমে অর্থাৎ কয়লার স্তরে বিভক্ত। এই ব্লক থেকে কয়লা তোলার ক্ষেত্রে মোট তিনটে চ্যালেঞ্জ রয়েছে।

প্রথমত, একদম ওপরের মাটির স্তর থেকে সঞ্চিত কয়লা পর্যন্ত একটা অতিরিক্ত স্তর (ওভারবার্ডেন) রয়েছে; এই ওভারবার্ডেন তৈরি হয়েছে ১-২০ মিটারের পাতলা পলিমাটির স্তর, অগ্ন্যুৎপাতের ফলে সৃষ্ট ৯০-২৪৫ মিটারের কঠিন ব্যাসাল্ট পাথরের স্তর এবং তার নিচে পাললিক শিলার স্তর দিয়ে। অন্যান্য খনিগুলোতে সাধারণত মাটিমেশানো পাথরের ওভারবার্ডেন থাকে, যাকে সহজেই সরিয়ে ফেলা যায়। কোল ইন্ডিয়ার প্রাক্তন চেয়ারপার্সন পার্থ ভট্টাচার্যের মতে, “এইরকম শক্ত ভূত্বক খনন করার একটাই উপায় হল বিস্ফোরণ, কিন্তু এর জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি বা দক্ষতা ভারতে নেই।”

দ্বিতীয়ত, কয়লার সিমগুলোর বেধ বা পুরুত্ব ৭৯.৮৯ মিটার পর্যন্ত, যা কিনা খননকার্যের জন্য প্রয়োজনীয় আদর্শ বেধের (৪-১০ মিটার) তুলনায় অনেকটাই বেশি। আর তাই এত বড় একটা খনিকে সামলানোর রসদ যোগানো একটা দুঃস্বপ্নের মতো ব্যাপার হতে চলেছে।

তৃতীয়ত, ব্লকের সর্বাধিক গভীরতা হল ৮৫০ মিটার মতো। ভারতের ক্ষেত্রে সাধারণত খোলামুখ খনির কাজ হয়ে থাকে সর্বাধিক ৩০০ মিটার গভীরতায়, আর মাটির তলার খনির খনন হয় ৬০০-৭০০ মিটারের মধ্যে। কেন্দ্র সরকার ও তেলেঙ্গানা সরকারের সংযুক্ত মালিকানাবিশিষ্ট সিঙ্গারেনি কোলিয়ারি কোম্পানির অধিকর্তা (অপারেশনস) এস চন্দ্রশেখরের কথায়, “এই প্রকল্প প্রযুক্তিগত দিক দিয়ে সম্ভব মনে হলেও ওই পুরু ব্যাসাল্ট এর স্তর ভেদ করার জন্য আমাদের আন্তর্জাতিক মানের দক্ষতার ওপর ভরসা করতে হবে, যা কিনা যথেষ্ট খরচসাপেক্ষ। তাছাড়া, আপনি ভূ-স্তর থেকে যত নিচে যাবেন, তাপমাত্রা তত বাড়তে থাকবে। ফলে তাপমাত্রা ঠিক রাখার জন্য অতিরিক্ত যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তি লাগবে – যা এই প্রকল্পের খরচ আরো অনেকটা বাড়িয়ে দেবে। ফলে, এই প্রকল্প আদৌ অর্থনৈতিকভাবে কার্যকরী হবে না।” তাঁর মতে, এই ব্লক থেকে কয়লা তোলার জন্য খোলামুখ খনি (বিশেষত অগভীর জায়গাগুলোয়) ও মাটির তলার খনি, এই দু’ধরনের পদ্ধতির একটা মিশেল লাগবে। ২০১৯-২০২০ সালের ভারতের কোল ডাইরেক্টরি অনুযায়ী, বর্তমানে ভারতের ৬% খনিতে এইরকম মিশ্র পদ্ধতিতে কাজ হয়।

সরকার কিন্তু অপেক্ষাকৃত আধুনিক গ্যাসীয়করণ পদ্ধতির মাধ্যমে কয়লাকে তড়িৎদ্বারের সাহায্যে প্রাকৃতিক গ্যাসে পরিণত করেও এই বিপুল পরিমাণ কয়লা ব্যবহার করতে পারে। এর ফলে মাটি খুঁড়ে গভীরে থাকা কয়লার স্তর অবধি পৌঁছনোর দরকারই হবে না। পার্থ ভট্টাচার্যের মতে, “আমরা তো আসলে কয়লার শক্তিকে চাই, কেবল কয়লাকে তো চাই না। প্রযুক্তি কিন্তু এখনো সেইমতো তৈরি নয়।” ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর কেন্দ্রের কয়লামন্ত্রক ন্যাশনাল কোল গ্যাসিফিকেশন মিশন নামে একটা নথি প্রকাশ করে। সেখানে বলা হয় যে, কয়লাকে গ্যাসে পরিণত করা মানে নির্মল শক্তির (পরিবেশ বান্ধব) দিকে আর এক ধাপ এগোনো। এই বিষয়টা খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ভারত ২০১৬ সালের প্যারিস চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী।

এই প্রকল্পের নোডাল এজেন্সি ওয়েস্ট বেঙ্গল পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশনের তথ্য অনুযায়ী দেউচা-পাচামির কয়লার মান জি৩-জি-১৪, আর দেওয়ানগঞ্জ-হরিণসিঙ্গায় তা জি-৬–জি-১৪। পার্থ ভট্টাচার্যের মতে এমনকি এই কয়লার মানও গড়পড়তা ও মাঝারি। তাঁর কথায়, “জি-১০-এর থেকে বেশি মানেই সেই কয়লাকে ধরা হয় মাঝারি মানবিশিষ্ট, যাতে ছাইয়ের পরিমাণ বেশি আর শক্তি উৎপাদনের ক্ষমতা বা ক্যালোরিফিক ভ্যালু কম। এই ধরনের কয়লা শক্তি উৎপাদনের ক্ষেত্রে কাজে লাগে। ইস্পাতের মতো বিশেষ ধরনের শিল্পক্ষেত্রে যে কয়লা লাগে তার মান জি-৩ বা তার নিচে হয়। এগুলো হল ভালো মানের কয়লা।”

এই চ্যালেঞ্জগুলোকে মাথায় রাখলেই বোঝা যায় কয়লার থেকেও ওই ব্যাসল্ট পাথরের উপরিস্তর বা ওভারবার্ডেন আসলে বেশি লাভজনক। এই অঞ্চল জুড়ে রয়েছে প্রায় ৪২ হাজার ১৫০ লক্ষ টন ব্যাসল্ট, আর ব্যাসল্টের বোল্ডারের গড় দাম হল প্রতি টনে ২৩০ টাকা। যদি ঠিকভাবে বিষয়টা কাজে লাগানো যায়, তবে শুধু পাথর থেকেই রাজস্ব আসতে পারে ৯০০ কোটি টাকার বেশি। বর্তমানে ওই কয়লা ব্লকের ১৮টা গ্রামে এরকম অনেক ছোট ছোট পাথর খাদান আছে। তাদের মধ্যে কিছু কিছু আইনি হলেও বেশিরভাগই বেআইনি।

আদিবাসী মানুষদের বিপদ

ওয়েস্ট বেঙ্গল পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী প্রকল্পের অধীন গ্রামগুলো ১০টা মৌজায় ছড়িয়ে রয়েছে, আর এই কয়লাখনির প্রকল্প ৪৩১৪টা বাড়ির মোট ২১০০০ মানুষকে ভিটে থেকে উচ্ছেদ করবে। এদের মধ্যে ৯০৩৪ জন হলেন তপশিলি সাঁওতাল উপজাতির মানুষ, আর ৩৬০১ জন তফশিলি জাতির। এছাড়া, প্রকল্পের জন্য চিহ্নিত জমির ৭০ শতাংশের বেশি জমির মালিক স্থানীয় মানুষেরা, মাত্র ২০ শতাংশ জমি সরকারের। বাকি ৩৩ শতাংশ জমি বনভূমি।

রাজ্যের রাজধানী কলকাতা থেকে ২০০ কিমি দূরে অবস্থিত দেওয়ানগঞ্জ মৌজার বাসিন্দারা ভয় পাচ্ছেন যে, এই প্রকল্প হলে, তাঁরা নিজের দেশেই উদ্বাস্তু হয়ে যাবেন। এঁদের বেশিরভাগই জীবিকাসূত্রে চাষাবাদ কিংবা পাথর খাদানগুলোয় কাজের সঙ্গে যুক্ত। ওঁরা মনে করেন, জমিতে ধান, দানাশস্য ও নানারকম সবজি চাষ খেয়েপরে বেঁচে থাকার জন্য যথেষ্ট। তাই যদি তাঁরা জমি থেকে উৎখাত হয়ে যান, তখন খোলা বাজার থেকে খাদ্য ক্রয় করতে হবে। শ্রমিক হিসেবে কাজ করে তারা কিছু অর্থও রোজগার করেন। এখানকার অধিবাসীদের আরেকটা পরম্পরাগত জীবিকা আছে, সেটা হল পশুপালন। বেশিরভাগ বাড়িতেই গরু, ভেড়া বা মোষ রয়েছে। যখন চাষবাস হয় না, তখন ঐ পশুগুলোই তাদের বেঁচে থাকতে সাহায্য করে। তাঁদের বক্তব্য, সরকার তো তাদের পশুগুলোকে পুনর্বাসন দেবে না। ওই ১৮টা গ্রামের প্রত্যেকটায় একটা করে জাহের থান বা পবিত্র সমাধি রয়েছে, যা ওখানকার বাসিন্দাদের সংস্কৃতির একটা অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। এই প্রকল্পের সীমানার মধ্যে যে বনভূমি পড়ছে, তাতে শাল, অর্জুন, নিম, শিরিষ, মহুয়া, মেহগনি, বাঁশ, ইউক্যালিপটাস অ্যাকেসিয়ার মতো। প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে-ওঠা প্রায় পঞ্চাশ হাজার গাছ আছে। এই সবকটা গাছই কাটা পড়বে।

অস্ট্রিয়ার ভিয়েনা শহরের একটি অলাভজনক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন অফ ফরেন্ট্রি রিসার্চ অর্গানাইজেশনের বনভূমির ইতিহাস সংক্রান্ত দপ্তরের প্রাক্তন চেয়ারপার্সন অজয় রাওয়াতের মতে, “এই গাছ ভারতের একটা মেট্রোপলিটন শহরের গড়পড়তা অর্ধেক গাছের (tree cover) সমতুলা। কিন্তু বননিধনের প্রক্রিয়া ভূগর্ভস্থ জলের স্তরকে আরও নামিয়ে দেবে, যার দরুণ ভূমিক্ষয় অবশ্যম্ভাবী।”

এখানকার অধিবাসীদের আরেকটা পরম্পরাগত জীবিকা আছে, সেটা হল পশুপালন। বেশিরভাগ বাড়িতেই গরু, ভেড়া বা মোষ রয়েছে। যখন চাষবাস হয় না, তখন ঐ পশুগুলোই তাদের বেঁচে থাকতে সাহায্য করে। তাঁদের বক্তব্য, সরকার তো তাদের পশুগুলোকে পুনর্বাসন দেবে না। ওই ১৮টা গ্রামের প্রত্যেকটায় একটা করে জাহের থান বা পবিত্র সমাধি রয়েছে, যা ওখানকার বাসিন্দাদের সংস্কৃতির একটা অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। এই প্রকল্পের সীমানার মধ্যে যে বনভূমি পড়ছে, তাতে শাল, অর্জুন, নিম, শিরিষ, মহুয়া, মেহগনি, বাঁশ, ইউক্যালিপটাস অ্যাকেসিয়ার মতো। প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে-ওঠা প্রায় পঞ্চাশ হাজার গাছ আছে। এই সবকটা গাছই কাটা পড়বে।

সরকারের প্রতি অনাস্থা

রাজ্য সরকারকে চাপ দিয়ে প্রকল্প প্রত্যাহার করার উদ্দেশ্যে স্থানীয় বাসিন্দারা এই বছরের ফেব্রুয়ারি মাসের শুরুতে “বীরভূম জমি, জীবন, জীবিকা ও প্রকৃতি বাঁচাও মহাসভা” তৈরি করে। গত ২১ ফেব্রুয়ারি মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ক্ষতিপূরণের এক নতুন প্যাকেজ ঘোষণা করেন এবং দাবি করেন যে তাঁর সরকার মানুষের থেকে জোর করে জমি অধিগ্রহণ করবে না। খননকার্যের পূর্বের কার্যকলাপ দেখাশোনা করা আর এই বিষয়ে এলাকার বাসিন্দাদের বিশ্বাস অর্জনের জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ করার জন্য ২০২১ এর নভেম্বর মাসে সরকার থেকে ১০ সদস্যর একটা কমিটি গঠন করা হয়েছে। বীরভূম জেলা পরিষদের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে “প্রকল্পের জন্য জমি দিতে চান” এমন বেশকিছু আবেদন জমা পড়েছে। ইতিমধ্যে এমন ৩৫০টা আবেদন তারা নাকি যাচাইও করা হয়েছে।

এলাকার বাসিন্দাদের সাথে কাজ করা সমাজকর্মীদের ধারণা কিন্তু অন্য। তাঁরা বলছেন, এই সংখ্যাগুলো সরকারের তৈরি করা। তাদের পক্ষ থেকে গত ৬ জানুয়ারি তথ্যের অধিকার আইনে রাজ্য সরকারের কাছে এই প্রকল্প অধিগ্রহণের আগে সরকারের তরফ থেকে কোনোরকম জনশুনানির ব্যবস্থা হয়েছিল কিনা, বা কোন্ আইনে ওখানকার জমি অধিগ্রহণ করা হচ্ছে, এইসব বিষয় জানতে চাওয়া হলেও, রাজ্য সরকার আজ অবধি তার কোনো উত্তর দেয়নি।

স্থানীয় মানুষের বক্তব্য, ক্ষতিপূরণের প্যাকেজ কাগজে কলমে দেখতেই ভালো লাগে। আসলে কার্যকরী কিছুই হয়না। উল্লেখ্য, বীরভূমের বক্রেশ্বর টাউনশিপের তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য যাঁদের উচ্ছেদ হতে হয়েছিল, দুই দশক পার হয়ে গেলেও তাঁরা আজও ক্ষতিপূরণ পাননি, এখনও অবধি ক্ষতিপূরণের দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যেতে হচ্ছে। মানুষের আসলে সরকারের ওপর কোনো আস্থা বা ভরসা নেই।

ক্ষতিপূরণ প্যাকেজের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী, কয়লাখনির জন্য উচ্ছেদ হওয়া প্রতি প্রতিবারের একজন করে সদস্য রাজ্য পুলিশে স্থায়ী চাকরি পাবে। রাজ্যে চুক্তিভিত্তিতে কাজ করা পুলিশকর্মীর সংখ্যা প্রায় দশ হাজার। একটা সরকার, যারা কিনা ইতিমধ্যেই কর্মরত চুক্তিভিত্তিক কর্মীদের স্থায়ী করছে না, ফলত দেউচা পাচামির সাধারণ মানুষ বিশ্বাস করতে চাইছে না যে এখানকার মানুষদের সরকার স্থায়ী চাকরি দেবে।

সরকার যেভাবে খনি প্রকল্পটাকে দেখাতে চাইছে তার মধ্যে এবং যে প্রক্রিয়ায় খনি প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে চাইছে তা বিতর্কের ঊর্ধ্বে নয়। এবং স্বছতার যথেষ্ট অভাব রয়েছে। প্রকল্প সম্পর্কে সাধারণকে অন্ধকারে রেখে সরকারি ও প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার করে মিথ্যা, কৌশল ও গায়ের জোরে, স্থানীয় অধিবাসীদের মতামতের বিরুদ্ধে গিয়ে, আইনগত পদ্ধতি না মেনে, অবিশ্বাস্য দ্রুততার সঙ্গে যেভাবে রাজ্য সরকার এই প্রকল্প চালু করে দিতে চাইছে, তা থেকে একটা কায়েমি স্বার্থ রক্ষার গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। এই সরকারি অপচেষ্টার বিরুদ্ধে সার্বিক প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ গড়ে তোলা আমাদের সবার কর্তব্য।

——

ক্ষতিপূরণ প্যাকেজের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী, কয়লাখনির জন্য উচ্ছেদ হওয়া প্রতি প্রতিবারের একজন করে সদস্য রাজ্য পুলিশে স্থায়ী চাকরি পাবে। রাজ্যে চুক্তিভিত্তিতে কাজ করা পুলিশকর্মীর সংখ্যা প্রায় দশ হাজার। একটা সরকার, যারা কিনা ইতিমধ্যেই কর্মরত চুক্তিভিত্তিক কর্মীদের স্থায়ী করছে না, ফলত দেউচা পাচামির সাধারণ মানুষ বিশ্বাস করতে চাইছে না যে এখানকার মানুষদের সরকার স্থায়ী চাকরি দেবে।

ঋণস্বীকার: ডাউন টু আর্থ পত্রিকা

এই নিবন্ধটি শেয়ার করুন
মতামত দিন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *